১৫ নভেম্বর,২০০৭
সকাল সাড়ে দশটা
অনেকক্ষণ ধরেই কলম হাতে নিয়ে বসে আছি।বুঝে উঠতে পারছিনা ঠিক কোথা থেকে শুরু করা যায়।সকালবেলা থেকে মনের মধ্যে যে জড়তা তা আমার কলমে এসেও ভর করেছে।আজ যে আমার সবচাইতে প্রিয় মানুষটার বিয়ে।আজ তিথির বিয়ে।
তিথি।দুই অক্ষরের এতটূকুন এই নামটা আমার মনের এত বড় একটা জায়গা কেমন করে কখন দখল করে নিল ভাবতে গেলে বড় অবাক হতে হয়।ভাবনার সাথে বিষাদও এসে ভর করে বৈকি। যে জায়গা জুড়ে শুধুই তিথি ছিল সেটুকুতে হঠাৎ করে যদি শূণ্যতা এসে ভর করে তাহলে তো এমনটিই হবার কথা।না,ভুল বল্লাম।তিথি নামটা মন থেকে এখনো যায়নি।কখনো যাবারও নয়।তিথিকে যখন তখন দু'চোখ ভরে দেখবার অধিকার আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার জন্য এ বিষাদ।অনেক বেশি রকমের গাঢ় এ বিষাদ...রাতের অন্ধকারের মত গাঢ়।
এতটুকু লেখার পর আবারো কিছু দীর্ঘশ্বাস।আরো কিছুক্ষণের জন্য কলম থেমে থাকা।তিথির ভাবনা মন থেকে সরিয়ে ঠিকমতো লিখতে পারছিনা।অথচ ভাবনার শুরু যে খুব বেশি দিন থেকে নয় আমাদের দুজনকে দেখে সেটা কে বলবে।কয়েক মাসের মধ্যেই দুজনেই কেমন ভালবাসার এপিঠ ওপিঠ দেখে ফেললাম।যতদিন পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক ছিল দিনগুলো কেমন ছবির মত ছিল।রাতের বেলা তিথির কন্ঠের সুবাস নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়ে সকাল বেলা আবার ওর স্বপ্নগুলোকে সাথে করে ঘুম থেকে জেগে উঠতাম।তারপর... হঠাৎ ঘনিয়ে ওঠা ঝড়ে সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেল।অসুস্থ বাবার ইচ্ছার বলি হয়ে সব জেনে শুনেও একদিনের নোটিশএ ওকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হল।বিয়ে না বলে আস্ত একটা মানবীয় হৃদয়কে নির্দয়ের মত কাটাকুটি করা বললেই মনে হয় যথার্থ হয়।বিয়ে তো অনেক মহৎ ব্যাপার।বিয়ে মানে পরম মমতায় দুটো হৃদয় এক হয়ে যাওয়া,এক হৃদয় ভেঙ্গে দু ভাগ করা নয়।আর ছেলেটা,যার সাথে ওর বিয়ে হল;ওর ছেলে বেলার বন্ধু।ছোটবেলা থেকেই তিথির জন্য তার এতো বেশি ''ভালোবাসা'' যে তিথির চোখের কোনায় জমে ওঠা জল হাসিমুখে না দেখার ভান করে কী সুন্দর করে আমাদের ভালোবাসাকে গলা টিপে মেরে ফেললো। নিতান্ত অবহেলায় কারো ভালোবাসাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঠিক কেমনতরো ভালোবাসা বিনিময়ে আশা করা যেতে পারে তা' আজো বুঝে উঠতে পারলাম না।আমার মনে হয়ে কেউই তা' পারবেনা।everything is fair in love and war-কথাটার জন্ম নিশ্চয়ই এ ধরনের কোন ভালোবাসার কথা ভেবে হয়নি। জোর করে ভালোবাসা পাবার চেষ্টা করাটা মনের দৈন্যতা ছাড়া আর কিছু বলে আমি ভাবতে পারিনা।
তিথির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ১৩ জুলাই।মনে হতে পারে হঠাৎ আজ কেন দুঃখের ঝাঁপি খুলে বসলাম। আজ নভেম্বর এর পনেরো তারিখ।তিথি আজ সবার সামনে দিয়ে কনের সাজে সেজে আনুষ্ঠানিক ভাবে কারো ঘর ''আলো'' করতে যাচ্ছে। অন্য কারো কথা ভেবে যে তিথির বুকে আজ আঁধার জমে নেই সে কথা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবোনা।কাল রাতে ফোনে ওর কান্না শুধু যে বাবার ঘর চিরদিনের জন্য ছেড়ে যাবার কষ্টে নয় সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কেইবা জানে।
গতকাল দুপুরে মন খারাপ করে বিছানায় শুয়ে শুয়ে রেডিও ফুর্তি শুনছিলাম। RJ নুসরাত এর প্রোগ্রামের এদিন এস এম এস করার বিষয় ছিলো ''বিয়ে''।বিয়ের কোন জিনিসটা মজার,কোন খাবারটা খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে এসব বিষয় নিয়ে sms করা আরকি।সব বিষয়গুলোতেই কেমন আনন্দ ছড়ানো।কিন্তু আমার মতন মানুষ,যখন তখন যাদের দুচোখ কান্নায় ঝাপসা হয়ে আসে,তাদের কাছে বিয়ে মানে শুধুই সব হারানোর আরেক নাম।আনন্দ... সে তো বহু দূরের পথ।তাই আর আনন্দ আনন্দ ভাব নিয়ে sms করা হয়ে ওঠেনা স্মার্ট কোন RJ'র কথা শুনে। তবে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ র মত আকাশের ঠিকানায় নিয়মিত ই sms করে যাই; ভাল আছি আর সে যেন ভালো থাকে এই চাওয়া নিয়ে।আমি জানি আকাশ আমার সবগুলো sms অনেক মন দিয়ে পড়ে,কষ্টগুলো বোঝে।কখনো কখনো মানুষ ও মানুষকে বুঝতে ভুল করে,কিন্তু আকাশ করেনা। নইলে এ সপ্তাহের অন্য সব রোদজ্বলা দিনের মত না হয়ে আজকের দিনটাতেই কেন অমন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে।কখনো নীরবে,নিঃশব্দে,ঝির ঝির করে।কখনোবা দমকা হাওয়া সাথে করে নিয়ে। মাঝপথে ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার কান্নাগুলো ঠিক যেমন হয়......।
মাঝে মাঝে নিজের ওপর নিজেরই অনেক রাগ লাগে।সারাক্ষণ শুধু হারানোর কথা ভেবে যা পেয়েছি সেগুলোর কথা বেমালুম ভুলে যাই দেখে। অনেক কষ্ট বুকে জমা আছে এটা ঠিক।কিন্তু প্রাপ্তির পাল্লাও যে একেবারে খালি নেই। মুক্তোর মত যে ভালোবাসা আমি তিথির কাছ থেকে পেয়েছি অন্ধকারেও সেগুলো যখন অপার্থিব আলো বুকে নিয়ে ঝিকিয়ে ওঠে,পৃথিবীর সব অনুভূতির বাইরে এসে দাঁড়িয়ে অপার হয়ে আমি সে সৌন্দর্য উপভোগ করি।নিজেকে তখন দুঃখ রাজ্যের সবচাইতে সুখী মানুষ বলে মনে হয়।ক্যাডেট কলেজে আমার যে রুমমেটটা কোন এক মেয়েকে ভালোবেসে বিনিময়ে শুধুই দুঃখ পেয়ে ৩৩টা ঘুমের বড়ি খেয়ে যখন সব পার্থিব যন্ত্রণার উর্ধ্বে চলে যেতে চায়,নিজেকে তখন অনেক ভাগ্যবান মনে হয়।কিংবা কোন বন্ধু সদ্য ছ্যাকা খেয়ে গোল্ড লীফ এর ধোঁয়ায় মুখ ঢেকে পাশে বসে যখন বলে-''দোস্ত,মেয়ে জাতটাই খারাপ।ভালোবাসতে জানেনা,শুধুই কষ্ট দিতে জানে'' তখনো নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়।মনে মনে বলি-ভুল বন্ধু...ভুল।ওদের এমন ভাবনার দোষও ধরিনা কখনো।ওরা তো আর তিথিকে চেনেনা......।
সেদিন কোন এক পত্রিকায় সুনীল এর একটা কথায় হঠাৎ চোখ আটকে গেল।"তুমি যদি ভালো কবিতা লিখতে চাও তবে আগে প্রেমে পড়ো এবং ব্যার্থ হও।ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা থেকেই সবচেয়ে সুন্দর কবিতার জন্ম হয়।" অনেক কষ্টের মাঝেও সেদিন হেসে উঠেছিলাম অজান্তেই।সুনীল হবার শখ কোনদিনই ছিলোনা,হতে যে পারবোওনা কোনদিন সেটা বলাই বাহুল্য।তবে সুনীল এর প্রথম প্রেম হারানোর কষ্টটা কেমন ছিলো সেটা মনে হয় এখন জানি।আমরা দুজনেই যে দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে লাল কাপড় বেঁধে দেবার স্বপ্নে মেতে উঠেছিলাম...। আমি যে জিহাদ আছি সেই জিহাদ হয়েই থাকতে চেয়েছিলাম সারাটা জীবন।যার এক হাতের মুঠোয় অবাধ্য কিছু ভালোবাসা আর আরেক হাতের মুঠোয় তিথি নামের অসম্ভব সুন্দর মনের একটি মেয়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরা ছিলো। সময়ের ফেরে তিথির হাতটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।কিন্তু আরেক হাতের মুঠোয় ভালোবাসাগুলো আজো যত্ন করে চেপে ধরা আছে।সে ভালোবাসা কেবলি তিথির জন্য...।
মনটা আসলেই খারাপ,অনেক বেশি রকমের খারাপ।যতটা খারাপ হলে নিজে ছাড়া আর কেউ সেই মন খারাপ করা অনূভুতির ধারে কাছে ঘেঁষতে পারেনা।কাল বাবার চোখের অপারেশন।আজ আবার...।নাহ্...এত কিছুর মধ্যে 'ভাল আছি' ভাব করে ভাল থাকতে আর ভাল্লাগেনা।বাইরে এখনো বৃষ্টি হচ্ছে।হয়তোবা থেমে যাবে একটূ পরেই।মনের বৃষ্টি যে কখন থামবে কে জানে...
আমার এই শেষ কথা কটি শুধু তিথির জন্য।যদিও আমি চাইনা ও কোনদিন আমার এই লেখাটা পড়ুক।ভালোবাসা কী অদ্ভুত,কাছের মানুষের শুভ কামনায় মাঝে মাঝে কেমন যত্ন করে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়...
তিথি,আমাদের পরিচয়ের একেবারে প্রথম দিনটাতে 'অর্থহীন'এর যে গানটার অর্থ পরস্পরের মাঝে খুঁজে পেয়েছিলাম তা' আজো হারিয়ে যায়নি। মুখটা তুলে আকাশটাকে দেখো আরেকবার...তোমার সাথে আছি আমি যে চিরকাল...।আমি চিরকাল তোমার সাথে থাকবো।চোখ মেলে হয়তো কখনো দেখবেনা। একবার চোখ বুজে চেয়ে দেখো,আমায় ঠিকই খুঁজে পাবে...
তুমি ভালো থেকো...অনেক ভালো...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

